মেনু নির্বাচন করুন

হাটবাজার

১। মাঝিয়া কান্দি বাজার

 

হট্ট থেকে হাট ……হাট সপ্তাহের এক বা একাধিক নির্দিষ্ট দিনে ব্যাপক ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান। প্রচুর উপস্থিতি। বহু লোকের সমাবেশ। হট্ট। হাট করা মানে হাট থেকে দ্রব্যাদি কেনা, উন্মুক্ত করা, খোলা (দরজা হাট করে বসে আছো কেন ?)। বিশৃঙ্খল বা এলোমেলো করা, অগোছালো। প্রকাশ করা, যেমন হাটে ঢোল দেয়া। কোলাহল, চেঁচামেচি বা গোলমাল করা (ঘরে হাট বসিয়েছো না-কি?)।

হাটকানা – হাটের মধ্যে রকমারি জিনিস দেখে যার তাক লেগে যায়। হাটবসা, হাটলাগা – হাটে বেচা-কেনা শুরু হওয়া। হাটের মতো চেঁচামেচি, গ-গোল করা। হাটবসান – হাট স্থাপন করা, প্রচুর লোক আসা। হৈ চৈ বা চিৎকার করা।
হাটবার – হাটের দিন, সপ্তাহের যে দিনে বসে। হাটুরিয়া, হাটুরে – হাটে যে ক্রয়-বিক্রয় করে। হাটে বিক্রয় করার জন্য পণ্য বহনকারী। হাটে ক্রয়-বিক্রয়কারী। হাটের দুয়ারে কপাট – অসম্ভব ব্যাপার।
হাটে বিকানো – দশজনের দ্বারা আদৃত হওয়া। হাটে হাড়ি ভাঙ্গা – গোপন কথা প্রকাশ করা বা প্রকাশ হয়ে যাওয়া। ভাঙ্গাহাট – যে হাটে ক্রয়-বিক্রয় প্রায় শেষ হয়েছে। পড়ন্তাবস্থা। হাট হদ্দ – সকল ব্যাপার। সব খবর, শেষ সীমা।
হাটের আড্ডা …..‘হাট’ শব্দ নিয়ে কত অর্থ, কত ব্যবহার, কত ব্যাখ্যা আমরা বাংলা অভিধান খুললে আমরা পাই। এই শব্দ, খেলার মজা পেতে এবং জানার জন্য অনেকের নিয়মিত বাংলা অভিধান খুলে বসে। অনেকের জীবনে এটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। আমার জন্ম যদিও শহরে কিন্তু লেখাপড়া করার সময় দীর্ঘ চার/পাঁচ বছর কেটেছে গ্রামে। এই দীর্ঘ সময়ে হাটবারগুলো আমার কাছে মনে হতো উৎসব ও মিলনমেলার দিন। মজাদার আড্ডার দিন। যে গ্রামে থাকতাম শুধু সে গ্রামে নয়, স্কুল এবং কলেজের সহপাঠিরা মিলে বিভিন্ন হাটের দিনে মিলিত হতাম। ছোট্ট ঝুপড়ি মার্কা চায়ের দোকানে বসতো এই আড্ডা। হাটভাঙার সাথে সাথে আমাদেরও ফেরার পালা শুরু হতো।
চলতো খালি চা, কখনো চা-পিঁয়াজু-বিস্কিট, কখনো মিহিদানা, রসগোল্লা, জিলাপি। এখন সেই তরুণদের সেই ধরনের আড্ডা আর নেই। এখন এইসব হাট এখন সন্ত্রাসী দখলে। আমার স্কুল এবং হাটের আড্ডার অন্যান্য বন্ধুরা এসএসসি পরীক্ষায় কুমিল্লা বোর্ডে মেধাতালিকায় স্থান লাভ করেছিল। এখনো তার সাথে কিংবা তাদের কারো সাথেদেখা হলে মনটা আনন্দে ভরে উঠে। ভালো লাগে।
গ্রামীণ জীবনে হাট ……..গ্রামপ্রধান ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনেও হাট-বাজারে এক অনন্য ভূমিকা রাখছে। কুমিলা বার্ডের একজন গবেষক আ. ন. মো: মোস্তফা খন্দকার এক সমীক্ষায় নানান তথ্য উপস্থাপন করেছেন হাট-বাজারের উপর গবেষণা করতে গিয়ে। সেই সমীক্ষা পাঠ করে এবং একজন উন্নয়ন কর্মী হিসেবে মাঠ পর্যায়ের কাজে বাংলাদেশের উপকূলীয় হাট-বাজারের নানান বৈচিত্র্যময় চিত্র চোখের উপর ভেসে উঠে।
এক হাট এক এক কারণে বিখ্যাত। কোনোটা মুড়ির জন্য, কোনোটা শাড়ির জন্য, কোনোটা গরুর জন্য। দই কিংবা মিষ্টি, আম কিংবা জামের জন্য। কোনোটা মাছের পোনা বা মাছের জন্য। এইসব পণ্যকে ঘিরে এক একটি এলাকার অর্থনীতিও সেভাবে গড়ে উঠে। একটি জায়গা ভ্রমণে এক এক এলাকার প্রসিদ্ধ জিনিস খাওয়ার তৃপ্তিই আলাদা। অবশ্য বাংলাদেশের উন্নয়নকর্মীদের কাজের পাশাপাশি এই তৃপ্তি লাভ এক বাড়তি পাওনা বলেই অনেকে মনে করেন।
গ্রামীণ হাট-বাজারের মাধ্যমেই উৎপাদনকারী ও ভোক্তাগণ কৃষিজাত ও অন্যান্য পণ্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করে। হাট-বাজারের মাধ্যমেই শহরের উৎপাদিত পণ্যাদি গ্রামবাসী কাছে পৌঁছে। পল্লী উন্নয়নের সাথে সংশিষ্ট বহু সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা গ্রামীণ হাট-বাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠান, সংস্থা থেকে গ্রামীণ জনগণ তাদের প্রয়োজনীয় বিষয়ে পরামর্শ, উপকরণ ও সেবাদি সংগ্রহ করে থাকে। তা ছাড়া, বহু গ্রামীণ স্কুল ও কলেজ, হাট-বাজার সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত। অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী বিনোদনমূলক কর্মকা-গুলো – যাত্রা, কবিয়াল গান ও মেলা ইত্যাদি গ্রামীণহাট-বাজারকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সে জন্যই গ্রামীণ হাট-বাজারকে বাণিজ্যিক ও সামাজিক মিলনকেন্দ্র হিসাবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। এভাবে গ্রামীণ হাট-বাজারগুলো গ্রামীণ জনগণের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখে। যার গ্রামে দীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করছে এবং করেছে, আর যারা বাজার ব্যবস্থা এবং পণ্য বাজারহজাতকরণের সাথে জড়িত তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বা ধারণা আছে।
হাট-বাজারের প্রকারভেদ …..গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে সাধারণত দুই-তিন ধরণের হাট-বাজার দেখা যায় প্রথমত: কিছু হাট-বাজার আছে যেখানে অধিকাংশ দোকান স্থায়ী এবং এগুলো দৈনিক বা সপ্তাহে এক আ দু’বার অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয়ত: কিছু হাট-বাজার আছে যেগুলোতে কোনো স্থায়ী বা আধাস্থায়ী দোকান নেই। এগুলোও দৈনিক বা সপ্তাহে এক বা দু’বার অনুষ্ঠিত হয়। শুধুমাত্র বাজারের সময় নির্দিষ্ট স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে দোকান বসে। তৃতীয়ত: এমন কিছু হাট-বাজার দেখা যায় যেকানে কেবলমাত্র বিশেষ ধরণের পণ্য সামগ্রী ক্রয়-বিক্রয় হয়। এসব বাজারে দুর-দূরান্ত থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা আসে। যেমন নরসিংদী জেলার বাবুর হাট তাঁতের কাপড়ের জন্য প্রসিদ্ধ। এখানে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁতের কাপড়ের জন্য আসে।
এছাড়াও বাংলাদেশে কিছু বিশেষ ধরণের বাজার দেখা যায়। বিশেষ করে হিন্দু মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব উদযাপন উপলক্ষে এ সকল বাজার বসে। এ ধরনের বাজারকে ‘মেলা’ বলা হয়। এগুলো বৎসরে সাধারণত: নির্ধারিত এক দিন বা দু’দিন অনুষ্ঠিত হয়।
পুনশ্চ : হাট-বাজার ……গ্রামীণ হাট-বাজার এখনো গ্রামরে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। যা কিছু উৎপাদিত হয় তা হাটে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। বিশেষ দ্রব্যের জন্য বিখ্যাত হাটগুলো সাপ্তাহিক বিক্রির উপর তার উৎপাদিত পণ্যের ভবিষ্যত নির্ভরশীল। মধ্যসত্ত্বভোগীর কারণে পণ্য উৎপাদনকারী কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় না। তখন নির্দিষ্ট পণ্যের উৎপাদনকারী কৃষক ঐ পণ্য উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় কৃষকের স্বার্থের দিকেও দৃষ্টি দেয়া অত্যন্ত জরুরী। তাহলে একটি হাট যেমন তার সুনাম রক্ষা করবে তেমনি একটি নির্দিষ্ট পণ্য বা কৃষকের স্বার্থও রক্ষা পাবে।
এক সময় হাট-বাজারগুলোর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা ছিল সম্পূর্ণ জমিদারদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সে দিন এখন আর নেই। হাট-বাজারগুলোর উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ভারও তাদের হাতে ছিল। এখন স্থানীয়ভাবে হাটগুলো পরিচালিত হয়ে থাকে। নানা পথ পেরিয়ে এখন ইউনিয়ন পরিষদসমূহ সংশ্লিষ্ট হাট-বাজারের স্থায়ী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি বছর দোকান, লাইসেন্স ফি, চৌকিদারী ট্যাক্স ইতাদি বাবদ প্রচুর রাজস্ব সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু হাট-বাজার সংরক্ষণ ও উন্নয়নে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো সুনির্দিষ্ট ভূমিকা নেই। বর্তমানে প্রতিটি উপজেলা পরিষদ তার ভৌগোলিক সীমার মধ্যে অবস্থিত সরকারী হাট-বাজারগুলোকে বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী এক বৎসর বা অর্ধ বৎসর ভিত্তিতে ইজারা বন্দোবস্ত দিয়ে থাকে।
হাট-বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে গ্রামীণ জনগণ না ভাবলেও তাদের সকলের দাবী হাট-বাজারের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়া উচিত। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে এই হাট-বাজারের মাধ্যমে দোকানদার, পাইকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সবাই লাভবান হবে। জনগণ পাবে তার দোড়গোড়ায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রবা-সামগ্রী । আর তাদের উৎপাদিত কৃষি ও কুটির শিল্পজাত দ্রব্য-সামগ্রী শহরে বা দূরে বাজারজাত করতে পারবে। এক সময় তাই ভাবা হয়েছিল। এখন অবকাঠামোর উন্নয়ন হওয়ার সাথে সাথে এক শ্রেণীর টাউট পুরো হাটকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ফেলে। গ্রামীণ হাট-বাজারে সন্ত্রাসও বেড়েছে। এসব দিক বিবেচনা করে বর্তমানে হাট বাজারের উন্নয়ন এবং একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হলে মনে হয় একটি ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
এখন গ্রামীণ হাট-বাজারের চিত্র অনেক পাল্টেছে, হাটের মধ্যেই এখন পাকা মার্কেট উঠেছে। উঠছে। তবে, হাটের দিন বিশেষকিছু পারিবারিক প্রয়োজনীয় সামগ্রী উঠে যার জন্য সপ্তাহের ঐ একটি দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এই বিশেষত: গ্রামীণ কিছু কিছু হাটে এখনো রয়েছে